রাশিয়া বিশ্বকাপের সেরা একাদশ

Jul 17, 2018 10:01 pm

রাশিয়া বিশ্বকাপের সেরা একাদশ

বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্স দল। ছবি: সংগৃহীত

ফ্রান্সের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার মাধ্যমে শেষ হয়েছে বিশ্বকাপের এবারের আসর। ফুটবলবোদ্ধাদের মতে, রাশিয়া বিশ্বকাপ সেরাদের একটি। কেননা ঘটন-অঘটন সবকিছুই ঘটেছে এই বিশ্বকাপে। অঘটন বলতে ২০১৪ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন জার্মানির গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়, দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার নকআউট পর্ব থেকে বাদ পড়া, ফেবারিট হয়েও বিশ্বকাপের সেরা সফল দল ব্রাজিলের কোয়ার্টার ফাইনাল পেরোতে ব্যর্থ হওয়া।

ফেবারিট দলরা অঘটন ঘটালেও এবারের বিশ্বকাপ দু’হাত ভরে দিয়েছে ফ্রান্স, ক্রোয়েশিয়া, ইংল্যান্ড, বেলজিয়ামকে। বেলজিয়াম ও ক্রোয়েশিয়া বিশ্বকাপ ইতিহাসে তাদের সেরা সাফল্য পায় এবার। ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর পর দ্বিতীয় বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে ফ্রান্স।

মাসব্যাপী এই লড়াইয়ে অনেক নতুন কিছু দেখেছে পুরো বিশ্ব। বিশ্বকাপে নিজের ঝলক দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন অনেক ভালো ফুটবলার। আবার অজানা অনেকেই জ্বলে উঠেছেন এই আসরে।

রাশিয়া বিশ্বকাপে কারা সেরা? তাদের পারফরম্যান্সই বা কেমন ছিল? পরিসংখ্যান ঘেঁটে বের করা তাদের নিয়েই এবারের বিশ্বকাপের ‘সেরা একাদশ’।

গোলকিপার

হুগো লরিস (ফ্রান্স)

ফ্রান্সের গোলকিপার হুগো লরিস।
একটা তরুণ দলকে নিয়ে কীভাবে বিশ্বকাপ জিততে হয় তা দেখিয়ে দিয়েছেন ফ্রান্সের অধিনায়ক ও গোলকিপার হুগো লরিস। অধিনায়কত্বের পাশাপাশি গোলবারের দায়িত্বটাও খুব ভালোভাবে সামলেছেন তিনি। তার অসাধারণ দক্ষতার কারণে কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ে ও সেমিফাইনালে বেলজিয়াম তাদের বিপক্ষে গোল করতে ব্যর্থ। এ ছাড়াও দারুণ কিছু শট বেশ ভালোভাবেই আটকান তিনি।

ডিফেন্ডার

থমাস মুইনার (বেলজিয়াম)

বেলজিয়াম ডিফেন্ডার থমাস মুইনার।
এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট দল ছিল বেলজিয়াম। সেমিফাইনালের আগ পর্যন্ত দল হিসেবে তারা হয়ে উঠেছিল অপ্রতিরোধ্য। আর তাই ডিফেন্সে কোচ রবার্তো মার্টিনেজের অন্যতম ভরসা ছিল রাইট ব্যাক থমাস মুইনার। কোচের সেই আস্থার প্রতিদান ভালোমতোই দিলেন এই পিএসজি ডিফেন্ডার। ছয় ম্যাচে দলের হয়ে ২০৫টি পাস ও ৭টি বল ক্লিয়ার করেন তিনি। ডিফেন্সের পাশাপাশি আক্রমণে বল যোগান দেওয়ার জন্য পারদর্শী ছিলেন এ ফুটবলার। তৃতীয় স্থান নির্ধারণীর ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একটি গোলও করেন মুইনার।

রাফায়েল ভারানে (ফ্রান্স)

ফ্রান্সের ডিফেন্ডার রাফায়েল ভারানে।
সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কোচ অ্যালেক্স ফার্গুসন বলেছিলেন, ‘স্ট্রাইকার আপনাকে ম্যাচ জিতিয়ে দেবে কিন্তু ডিফেন্ডার আপনাকে পুরো টূর্নামেন্ট জিতিয়ে দেবে।’ আর সেই কাজটাই করে দেখালেন ফরাসি ডিফেন্ডার রাফায়েল ভারানে। পুরো বিশ্বকাপে দলের রক্ষণের স্তম্ভ হয়ে ছিলেন এই সেন্টার ব্যাক। লুকাকু, সুয়ারেজের মতো খেলোয়াড়দের একাই সামলেছেন তিনি। ডিফেন্সের পাশাপাশি আক্রমণেও বেশ দক্ষতা দেখিয়েছেন এই মাদ্রিদ ফুটবলার। উরুগুয়ের বিপক্ষে তার করা গোলেই এগিয়ে যায় ফ্রান্স। এই ম্যাচ ছাড়াও পুরো টুর্নামেন্টে দারুণ খেলেছেন তিনি।

দিয়েগো গোডিন (উরুগুয়ে)

উরুগুয়ের ডিফেন্ডার দিয়েগো গোডিন।
বরাবরের মতো এই বিশ্বকাপেও বেশ শক্ত ছিল উরুগুয়ের ডিফেন্স। অনেক বছর ধরেই উরুগুয়ের ডিফেন্সকে সামলাচ্ছেন অধিনায়ক দিয়েগো গোডিন। স্পানিশ লিগ লা লিগায় বরাবরের মতোই ভালো পারফরম্যান্স করে যাচ্ছেন অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ ফুটবলার। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন বিশ্বকাপেও। তার অসাধারণ পারফরম্যান্সের কারণে গ্রুপ পর্বে কোনো গোল হজম করেনি উরুগুয়ে।

সিমে ভ্রাজাকো (ক্রোয়েশিয়া)

ক্রোয়েশিয়ার ডিফেন্ডার সিমে ভ্রাজাকো।
প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে নেমেই তাক লাগিয়ে দেন ক্রোয়েশিয়ার ডিফেন্ডার সিমে ভ্রাজাকো। দলকে ফাইনালে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সেও সফল ছিলেন এই ফুটবলার। তার করা ৮টি ট্যাকলের মধ্যে ৪টিতে সফল ছিলেন তিনি। তার অসাধারণ ডিফেন্সেই গোল থেকে বঞ্চিত ছিলেন হ্যারি কেইন, মেসি সুয়ারাজের মতো তারকারা। ক্রোয়েশিয়ার হয়ে টানা তিনটি ম্যাচ ১২০ মিনিট খেলে যান এই ডিফেন্ডার।

মিডফিল্ডার

এন’গোলো কান্তে (ফ্রান্স)

লুকা মদ্রিচকে ট্যাকল করছেন ফ্রান্স মিডফিল্ডার এন'গোলো কান্তে।
রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে শিরোপা জেতাতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন এমবাপ্পে, পগবা ও গ্রিজম্যান। কিন্তু এই পর্দার আড়াল থেকে নায়ক হয়ে গেছেন ফ্রান্সের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার এন’গোলো কান্তে। পুরো টুর্নামেন্টে নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে সবার নজড় কাড়েন এই চেলসি ফুটবলার। সমানভাবে আক্রমণ ও ডিফেন্স—দুটোতেই বেশ উজ্জ্বল ছিলেন তিনি। বিশেষ করে নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তার পারফরম্যান্স চোখে লেগে থাকবে সবার। মেসিকে আটকানোর জন্য শিরোপা জেতার পর তাকে নিয়ে গানও গান ফ্রান্সের ফুটবলাররা।

লুকা মদ্রিচ (ক্রোয়েশিয়া)

রাশিয়া বিশ্বকাপের গোল্ডেন বলজয়ী ফুটবলার লুকা মদ্রিচ।

বর্তমানে বিশ্বের সেরা মিডফিল্ডারের তালিকা করলে প্রথমেই উঠে আসবে লুকা মদ্রিচের নাম। বিশ্বকাপে তার অধিনায়কত্ব ও অসাধারণ পারফরম্যান্সের কারণে নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফাইনালে ওঠে ক্রোয়েশিয়া। দলের হয়ে বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও আসরের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারটা ঠিকই নিজের পকেটে পুরেছেন এই রিয়াল মাদ্রিদ ফুটবলার। ক্রোয়েশিয়ার হয়ে ২টি গোল ও ১টি অ্যাসিস্ট করেন তিনি। এ ছাড়াও পুরো টুর্নামেন্টে দেওয়া ৫২৩টি পাসের মধ্যে ৪৩৯টিই কমপ্লিট করেন এই ফুটবলার।

কেভিন ডি ব্রুইনে (বেলজিয়াম)

বেলজিয়াম মিডফিল্ডার কেভিন ডি ব্রুইনে।
বেলজিয়ামে সোনালি প্রজন্মের মধ্যে অন্যতম সেরা খেলোয়াড় কেভিন ডি ব্রুইনে। বেলজিয়ামে আক্রমণভাগে বলের মূল যোগানদাতা ছিলেন এই ম্যানসিটি ফুটবলার। বেলজিয়ামের হয়ে তার দেওয়া ৩৪৪টি পাসের মধ্যে ২৭১টিতে সফল ছিলেন। এ ছাড়াও দলের হয়ে ২টি গোল ও ১টি অ্যাসিস্ট করেন তিনি। কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে তার অসাধারণ পারফরম্যান্সের কারণে ম্যাচসেরার পুরস্কার লাভ করেন এই ফুটবলার।

ফরোয়ার্ড

কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স)

ফ্রান্সের ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে।
পুরো বিশ্বের কাছে তারকা হওয়ার জন্য মনে হয় বিশ্বকাপের মঞ্চটাকেই বেছে নিয়েছিলেন ফ্রান্সের ১৯ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে। তার গতিময় ফুটবলশৈলী দেখে সবাই রীতিমতো মুগ্ধ। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তার এত গতি দেখে অবাক হন অনেকেই। বিশ্বকাপে নিজের অসাধারণ দক্ষতায় ফ্রান্সের হয়ে ৪টি গোল করেন তিনি। ২০ বছর পর ফ্রান্সকে আবারও বিশ্বকাপ জেতাতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন এই পিএসজি ফুটবলার। দলের হয়ে বিশ্বকাপ জেতার পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে আসরের সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কারটা নিজের করে নেন এমবাপ্পে।

অ্যান্তনিও গ্রিজম্যান (ফ্রান্স)

ফ্রান্সের ফরোয়ার্ড অ্যান্তনিও গ্রিজম্যান।
ফুটবলবোদ্ধাদের মতে এবার রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্সের অন্যতম সেরা পারফর্মারের নাম অ্যান্তনিও গ্রিজম্যান। দলকে শিরোপা জেতাতে মাঠের মধ্যে নিজের সবকিছুই দিয়েছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত দলকে বিশ্বকাপ জিতিয়েই বাড়ি ফেরেন এই ফরাসি ফুটবলার। দলের হয়ে ৪ গোল ও ২টি অ্যাসিস্ট করে নিজেকে গোল্ডেন বলের অন্যতম দাবিদার করেছিলেন গ্রিজম্যান। কিন্তু লুকা মদ্রিচের কারণে সেই পুরস্কারটা তার হাতছাড়া হয়ে যায়। তবে বিশ্বকাপ জেতায় ওই পুরস্কার নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই তার।

এডেন হ্যাজার্ড (বেলজিয়াম)

ফুটবলবোদ্ধাদের মতে, নিজেদের ইতিহাসে সেরা দল নিয়েই এবার বিশ্বকাপে খেলতে আসে বেলজিয়াম। সেই দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন এডেন হ্যাজার্ড। তার অধিনায়কত্বেই বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজেদের সেরা সাফল্য নিয়ে বাড়ি ফেরে রেড ডেভিলসরা। দলীয় সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সেও উজ্জ্বল ছিলেন চেলসির এই ফরোয়ার্ড। বেলজিয়ামের হয়ে ৩টি গোল ও ২টি অ্যাসিস্ট করেন হ্যাজার্ড। এ ছাড়াও বিশ্বকাপে সাতটি ম্যাচ খেলে তিনটিতে ম্যাচ সেরার পুরস্কার লাভ করেন তিনি।

সূত্র: ফক্স স্পোর্টস এশিয়া