৩৬তম বিসিএসে বিভিন্ন ক্যাডারে সুপারিশকৃত নবীন সহকর্মীদের উদ্দেশে

Oct 19, 2017 01:19 pm

৩৬তম বিসিএসে বিভিন্ন ক্যাডারে সুপারিশকৃত নবীন সহকর্মীদের উদ্দেশে

৩৬ তম বিসিএসে বিভিন্ন ক্যাডারে সুপারিশকৃত নবীন সহকর্মীদের উদ্দেশে
...................................................
শামীম আনোয়ার
এএসপি, ৩৪ তম বিসিএস ( পুলিশ)
...................................................
প্রিয় সহকর্মীবৃন্দ
সাধনা ও অধ্যবসায়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আপনারা যারা আমাদের ক্যাডার পরিবারে পা রেখেছেন,আপনাদেরকে অভিনন্দন। আপনাদের জীবনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে অগ্রজ হিসেবে কিছু কথা--

>>পা মাটিতেই রাখুনঃ
শুভেচ্ছা অভিনন্দনের জোয়ারে ভেসে যাওয়া, আশেপাশের মানুষগুলোর আচরণ হঠাৎ করেই বদলে যাওয়া( যেমন চলতে ফিরতে অনেকেই দেখবেন এখন আপনার মোবাইল নম্বর চাচ্ছে।) এই সময়ে পা মাটিতে রাখা কঠিন কাজই বটে।কিন্তু মোবাইলে, ফেসবুকে মেসেজ পাঠিয়ে বা কল দিয়ে আজ যারা আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন, তারা সবাই যে ভবিষ্যতে আপনার কাছ থেকে সুবিধা নেওয়ার জন্যই সেটি করছেন, এমনটা ভাববেন না।কল রিসিভ করে১/২ মিনিট হলেও কথা বলুন বা অন্তত থ্যাংকস জানিয়ে হলেও ফিরতি মেসেজ পাঠান।দেখবেন, সামান্য এ প্রাপ্তিতেই শুভাকাঙ্ক্ষী এ লোকগুলো শতমমুখে আপনার গুণকীর্তন করে চলেছেন।ভবিষ্যতে তাদের কেউ একজন কখন কিভাবে আপনার উপকারে এসে যাবে বুঝতেও পারবেন না।

দীর্ঘদিনের স্বপ্ন অভিযাত্রার সফল সমাপনে আজ আপনি বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন। প্রজাতন্ত্র তথা জনগণের কর্মচারী হবার গৌরবতিলক যখন কপালে পড়েছেন, একসময় ( আশা করা যায়) পদন্নোতির বন্ধুর পথ বেয়ে আপনি দেশের নীতিনির্ধারণী শীর্ষ পদে উপনীত হবেন। তবে সেই সময় যতক্ষণ না উপউপস্থিত হচ্ছে, এটাই বাস্তব সত্য যে, আপনি নবম গ্রেডের একজন চাকুরে মাত্র, বেশিরভাগ সময় বসের নির্দেশ প্রতিপালন করার বাইরে যার করার মতো তেমন কিছুই নেই।একবার ভাবুন, আপনার উপরে কতকত মানুষজন বসে আছেন।

>>আচরণে দৃশ্যমান পরিবর্তন সূচিত করুনঃ
কর্মস্থলে, বাজারে, রাস্তায় পরিচিত মহলের সবার নজরের কেন্দ্রে এখন আপনিই থাকবেন। আচরনের অনিচ্ছাকৃত সামান্য বিচ্যুতিও আপনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত সমালোচনার মুখোমুখি করে দিতে পারে।তাই আগের চেয়ে আরো বেশি বিনীত হোন। নিশ্চিত করে বলতে পারি, অন্যকে দেখানো সম্মান আপনি হাজারগুনে বেশি ফেরত পাবেন। মনে রাখবেন,ফলবতী বৃক্ষ কিন্তু সবসময় অববনতই থাকে।
আর মনে রাখবেন, আপনার যে সকল সহযোদ্ধা আপনার সাথেই প্রিলি, রিটেন, ভাইভায় অংশ নিয়েছিলেন,হয়ত ২/৪ মার্কসের ব্যবধানে আজ আপনি ক্যাডার হয়ে অভিনন্দনের জোয়ারে ভাসছেন, আর তিনি ননক্যাডার নিয়ে অব্যক্ত কষ্টে দগ্ধ হয়ে চলেছেন। চেষ্টা করুন, তার এ চরম দুর্দিনে দু মিনিট কথা বলেলে সান্তনা দেওয়ার। বড়ই হবেন,ছোট হবেন না এতে।

>>ক্ষমতা আছে, ক্ষমতা নেইঃ
আপনি এএসপি /ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে অনেক ক্ষমতার মালিক হয়ে গেছেন, ভাবছেন? ভুল, সবই ভুল। বাস্তবতার জমিনে পা রাখার জন্য প্রস্তুত হোন। একসময় অনুভব করবেন, একজন রিকশাচালকের ( তুচ্ছার্থে নয়) ক্ষমতাও আপনার চাইতে বেশি। আদতে আপনার কোন ক্ষমতাই নেই, যা আছে তা হল - দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য কিছু এখতিয়ার। তাই আগে যদি হেডম দেখানোর বাতিক থেকেও থাকে আজ রাত থেকে সেটি ভুলে যান।

>> মানবিক হোন
আপনি বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন, এটা আপনার একটা পরিচয় হতে পারে, তবে কখনওই প্রধান পরিচয় নয়। আপনার প্রধান পরিচয়, আপনি মানুষ হিসেবে কেমন, সেটা। আপনার আমার চাইতে অনেক যোগ্য লোক রাস্তায় রাস্তায় ঘুরলেও সৃষ্টিকর্তার কৃপায় আমরা বড় অবস্থানে এসেছি। তাই বড়াই বা আত্মঅহমিকার বদলে নিজের মানবিক গুণাবলি জাগ্রত করুন। আর যার বা যাদের কাছে আপনার ব্যক্তি পরিচয়ের চেয়ে ক্যাডার পরিচয়টাই মূখ্য , তাদেরকে এড়িয়ে চলতে সচেষ্ট হোন।

>>নিজের অবস্থানকে সম্মান করুনঃ
নিজের ক্যাডার বা অবস্থানকে ছোট ভেবে হীনমন্যতায় ভুগবেন না বা জনে জনে গিয়ে হতাশা প্রকাশ করবেন না। ভাল না লাগলে বা চাকুরী টা ছোট মনে হলে জয়েন করবেন না, কিন্তু অন্য জন তো ফার্স্ট চয়েস দিয়ে এই ক্যাডারে এসেছেন, তার অনুভূতি কে অসম্মান করার কোন রাইট আপনার নেই।

>>আন্তক্যাডার সম্পর্কঃ
এক ক্যাডার অন্য ক্যাডারের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পরিত্যাগ করুন। সকল ক্যাডারই সরকারের খাতায় সমান মর্যাদার আসনে অধিষ্টিত এবং রাষ্ট্রের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটাকে ছাড়া অন্যটা অর্থহীন হয়ে পড়ে। আজ আপনি নিজের ক্যাডারকে উপরে তুলতে অন্য ক্যাডারকে তুচ্ছ প্রমাণ করতে চাইছেন, অথচ মার্কসের সামান্য হেরফেরে আপনিও অন্যন্য ক্যাডার পেতে পারতেন। তখন হয়ত এই আপনিই আপনার বর্তমান ক্যাডারের নিন্দামন্দ করে বেড়াতেন। কি হাস্যকর, তাই না? মনে রাখবেন, অন্যকে সম্মান করলেই নিজে সম্মান পাওয়া যায়।

>>শিখুন, নিজেকে তৈরি করুনঃ
চামচামি স্বভাব নয়, বসের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করুন নিজের সততা- নিষ্ঠা - কর্মদক্ষতা দিয়ে। মনে রাখবেন, চামচামি করে কারো সাময়িক আনুকূল্য পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে আপনি কখনোই তা ধরে রাখতে পারবেন না। তাই শুরুর দিকের দিনগুলি ব্যয় করুন, ধৈর্য ধারন করে কাজ শেখা, কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি, বিভিন্ন ট্রেনিং এ অংশগ্রহণ প্রভৃতি কাজে।

>>সতর্কতাঃ
বিগত বিসিএসসমূহের রেকর্ড ঘাটলে দেখা যাবে,পিএসসি কর্তৃক বিভিন্ন ক্যাডারে সুপারিশ প্রাপ্ত প্রার্থীগণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থী পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক রিপোর্টের কারনে চূড়ান্ত নিয়োগলাভে ব্যর্থ হন। তাই আজ রাত থেকে শুরু করে যোগদানের পূর্ব পর্যন্ত মহাগুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে 'সমস্যা তৈরি করতে পারে' এমন কোন কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়া থেকে বিরত থাকুন।
যদি আগে থেকে আপনার বিরুদ্ধে আইনগত কোন প্রক্রিয়া চলমান থাকে, দ্রুত সেটি নিষ্পত্তি করে নিন।সমাজে আমাদের পাড়াপ্রতিবেশীদের মধ্যেও এমন অনেককেই খুঁজে পাবেন, যারা সবসময় আমাদের অশুভকামনা করেন (পুলিশি অভিজ্ঞতা থেকে বললাম)।তারা যত অগুরুত্বপূর্ণ -নগন্য ব্যক্তিই হোন, এদের নেতিবাচক ভূমিকার বিষয়ে সতর্ক হোন। কিছু দিনের জন্য নিজের অহম বিসর্জন দিয়ে নতি স্বীকার করে নিলে আপনার সম্মান ধূলোয় মিশে যাবে না। সারাজীবন তো আপনার জন্য পড়েই আছে। (আমি ভয় দেখাচ্ছি না, বরং সাবধান করছি, মন থেকে চাই, যেন এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি কাউকে ফেস না করতে হয়) অন্যায় ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে কেউ আপনাকে হয়রানির চেষ্টা করলে আমাকে দয়া করে নক করবেন, পরামর্শ দিয়ে পাশে থাকার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

>>এবং প্লিজঃ
যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের অগ্রগতির চাকাকে সচল রেখেছেন, অহর্নিশ খেটে আপনার আমার অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান করছেন, সেই কৃষক-শ্রমিক- জেলে-কামার- কুমোর- তাতী - মাঝি দেরকে তাচ্ছিল্যের চোখে দেখবেন না। নিজের একটু কষ্ট বেশি যদি হয়ও, তবুও তাদের জন্য আন্তরিক সেবা নিশ্চিত করুন। কোনভাবে যেন তাঁরা হয়রানির শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করুন। নারী ও বয়স্কদের প্রতি সংবেদনশীল হোন।

সবশেষে বলব, নিজের স্বাস্থের প্রতি যত্নবান হবেন। সঠিক সময়ে খাওয়া- ঘুম, ভোরে উঠে নিয়মিত শরীর চর্চা, ধূমপান না করার মতো সাধারণ বিষয়গুলো মেন্টেইন করুন। নিজেই যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন, রাষ্ট্রের সেবা, জনগনের সেবা কি করে করবেন। শুভকামনা নিরন্তর।

আপনাদের সহকর্মী

শামীম আনোয়ার
এএসপি, ৩৪ তম বিসিএস (পুলিশ)  BCS Our GOAL